বরোগ সাহেবের আত্মা আজও আছে সিমলা-কালকা রেল পথের এই টানেলে

বরোগ

বরোগ সাহেবের অতৃপ্ত আত্মা আজও ফিরে ফিরে আসে এই টানেলের কাছে। অপূর্ব সুন্দর পাহাড়ি পথে ছুঁয়ে যায় অশরীরী এক অনুভূতি। ভারতের অন্যতম সেরা পাহাড়ি ট্রেন যাত্রার অন্যতম এই কালকা-সিমলা রেল পথ। কাকভোরে কালকা থেকে হেলতে দুলতে বেরিয়ে পড়া ট্রেনটি সিমলা পৌঁছে দেয় ছ’ঘণ্টায়। এই পথেই রয়েছে সেই স্টেশন যেখানে আজও ফিরে আসেন তিনি। তার কথাই আজ বললেন মেঘ চক্রবর্তী


পাহাড়ের বুক চিরে ৯৬ কিলোমিটারের এই রেল পথ গিয়েছে ১০২টি টানেলের মধ্যে দিয়ে। আগে ছিল ১০৭টি, পরে তা কমিয়ে আনা হয়। তারই একটি বরোগ টানেল। টানেল লাগোয়া স্টেশনও রয়েছে একই নামে। কালকা থেকে সিমলা যাওয়ার পথে এই স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াবেই। দিনের আলোয় সেই ছমছমে অনুভূতি টের না পেলেও ফেরার পথে রাতে পৌঁছেছিলাম সেই স্টেশনে। রাতের খাওয়ার ওই স্টেশন থেকেই তোলা হয় ট্রেনে।

যাওয়ার সময় সকালেই বুঝেছিলাম অন্য টানেলের থেকে এই টানেল আলাদা। বাইরের আলো ঢোকে না এতটা বড় হওয়ায়। রাতে সেই নিকষকালো টানেলের মধ্যে যখন ট্রেনটা ঢুকে পড়ল তখন গোটা ট্রেনকে দেখলাম প্রমাদ গুনতে। আড়াই মিনিট পর সবাই হাফ ছাড়ল।

এই পথের দুটো দীর্ঘতম টানেলের মধ্যে একটি বরোগ। দ্বিতীয়টি তারা দেবী। তৈরি হয়েছিল ১৯০০-১৯০৩-এর মধ্যে। কাহিনী বরোগ টানেলের। এই টানেলের নম্বর ৩৩। ব্রিটিশ রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ার বরোগ সাহেবের নামেই পরবর্তী সময়ে এই টানেলের নাম দেওয়া হয়।

কিন্তু কেন?

বারোগ

বরোগ স্টেশন

হিমাচলের সোলান জেলার এই গ্রামের নামও বরোগ হয়ে যায়। উচ্চতা ৫,১২০ ফিট। এই রাস্তার সব থেকে বড় টানেল বরোগ পেরোতে ট্রেনের সময় লাগে আড়াই মিনিট। বিশ্বের একমাত্র পাহাড়ি টানেল যেটা একদম সোজা। প্রথমে এই টানেল তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কর্নেল বরোগকে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নাম করা ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন তিনি। কিন্তু এই টানেল তৈরির সময় তিনি একটি ভুল করে বসলেন।

কী সেই ভুল?

বরোগ সাহেবের টিম দু’ভাগে ভাগ হয়ে পাহাড়ের দু’দিক থেকে টানেল খোদাইয়ের কাজ শুরু করে। তিনি তাঁর দলকে বলেছিলেন, যে হিসেবে খোদাই করতে বলা হয়েছে তাতে দু’দিক থেকে খোদাই করতে করতে এলে একটা সময় দুটো মুখ মিলে যাবে এবং একটি টানেলের রাস্তা তৈরি হবে।

বারোগ

বরোগ স্টেশনে দাঁড়িয়ে সিমলা-কালকা টয় ট্রেন

দু’দিক থেকে কর্মীরা কাজ শুরু করে। যেখানে দুটো মুখ মেলার কথা ছিল সেই জায়গা পেরিয়ে চলে যায় খোদাইয়ের কাজ কিন্তু মুখ দুটো মেলে না। অনেকটা খোদাইয়ের পর কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েন এবং সন্দেহ তৈরি হয় বরোগের হিসেবের উপর। তিনিও বুঝতে পারেন তাঁর ভুল হিসেবের জন্যই এই ঘটনা ঘটেছে।

ব্রিটিশ সরকারের শাস্তির মুখে পড়েন তিনি। তাঁর নিজের ভুল বুঝতে পেরে তিনি হতাশ তো ছিলেনই সঙ্গে এই শাস্তি। তাঁকে ১ টাকা জরিমানা করা হয় সরকারি সম্পত্তি নষ্টের জন্য। রেগে যান তাঁর কর্মীরাও। সেই অপমান, অপবাদ মেনে নিতে পারেননি তিনি। একদিন নিজের কুকুরকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে গ্রামের মধ্যেই নিজের বন্দুক দিয়ে গুলি করে আত্মহত্যা করেন। সেখানেই এখন তৈরি হয়েছে রাজ্য সরকারের বরোগ পাইন উড হোটেল।

মালিককে রক্তে ভেসে যেতে দেখে কুকুরটি ছুটে যায় বরোগ রেল স্টেশনের কাছে সাহায্যের জন্য। তখনও সেখানে স্টেশন তৈরি হয়‌নি ছিল গ্রাম। তবে কেউ পৌঁছনোর আগেই বরোগের মৃত্যু হয়। আরও একটি কথা শোনা যায় তিনি নিজেকে গুলি করার আগে তাঁর কুকুরটিকেও মেরেছিলেন। টানেলের কাছেই তাঁকে সমাধিস্ত করা হয়।

সিমলা-কালকা টয় ট্রেন

পরবর্তী সময়ে সেই ভুল টানেল বন্ধ করে নতুন করে টানেলের কাজ শুরু হয়। দায়িত্ব দেওয়া হয় এইচএস হার্লিংটনকে।  তিনিও একই সমস্যয় পড়েন। স্থানীয় এক সাধু বাবা ভালকু শেষ পর্যন্ত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। তার পর তৈরি হয় এই টানেল পুরনো জায়গা থেকে এক কিলোমিটার দূরে। বরোগের স্মৃতিতে এই ট্রেন ও স্টেশনের নাম রাখা হয়।

এই টানেলের ভিতরের পরিবেশ অন্য টানেলের থেকে আলাদা। সব সময় একটা স্যাঁতস্যাঁতে ভাব থাকে। দেওয়ালের গা বেয়ে জল সারাক্ষণ নেমে আসে। অন্ধকারটাও অন্য টানেলের থেকে আলাদা। এই টানেলেই গ্রামের মানুষরা বরোগ সাহেবকে ঘোরাফেরা করতে দেখেন রাতের অন্ধকারে। তবে কথিত আছে তিনি কারও ক্ষতি করেন না। দেখেন তাঁর সাধের সেই লাইনে ট্রেনের যাতায়াত, বিশ্বের একমাত্র সোজা পাহাড়ি টানেল যা তাঁর হাতে তৈরি হওয়ার কথা ছিল। গ্রামের মানুষরা এমনও বলেন, কেউ কেউ তো ওই স্টেশনে বসে বরোগ সাহেবের সঙ্গে গল্পও করেছেন। ট্রেনের চালকরাও টানেলের আশপাশে কারও উপস্থিতি অনুভব করেছেন কখনও কখনও।

সবই শোনা কথা। আমরা বরোগ সাহেবের দেখা পাইনি। তবে আড়াই মিনিটের টানেল যাত্রার কথা ভাবলে আজও গায়ে কাটা দেয়।

ছবি: লেখক

(একটু অন্য ধরনের অভিজ্ঞতার স্বাদ পেতে ক্লিক করুন এই লিঙ্কে)

(জাস্ট দুনিয়ার ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন)