সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় পা দিলেন ৪৮-এ, ফিরে দেখা তাঁর জার্নি

সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়

জাস্ট দুনিয়া ডেস্ক: সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় নামটা আসলে বাঙালিদের কাছে একটা আবেগ তার পর তিনি ভারতীয় দলের অধিনায়ক, তার পর তিনি বিসিসিআই-এর সভাপতি। ভারতীয় ক্রিকেটে বাংলার একমাত্র সাফল্য তো তিনিই। তাই তাঁকে নিয়ে যে আমরা গর্ব করব সেটাই স্বাভাবিক। তাঁকে নিয়ে বাঁচব, তাঁকে নিয়ে লড়াই করব, তাঁকেই বিশ্ব ক্রিকেটের মসনদেও দেখার স্বপ্ন দেখব। তিনি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় । বুধবার  ৪৮ বছরে পা দিলেন তিনি।

সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম হলেও ক্রিকেটার সৌরভের জয়যাত্রাটা তেমন ছিল না। লড়াইটা শেষ দিন পর্যন্ত কঠিন ছিল তাঁর জন্য। যাঁদের হাত ধরে ভারতীয় ক্রিকেটে তিনি জায়গা করে দিয়েছিলেন তাঁরাই একটা সময় তাঁকে পিছন থেকে ছুড়িটাও মেরেছিলেন। কিন্তু কখনও সৌরভকে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোনও অভিযোগ করতে শোনা যায়নি। সে তিনি গ্রেগ চ্যাপেলই হোক বা এমএস ধোনি।

তবে আজ তাঁর জন্মদিনে সেই সব কথা না বলে বরং ফিরে দেখা যায় তাঁর লড়াইটা। যা আজও আপামর ভারতবাসীকে প্রেরণা জোগায়। সালটা ১৯৯২-এ ভারতীয় দলে জায়গা পেলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে একটি ম্যাচ খেলেই বাদ পড়তে হল তাঁকে। সেই সময় একটা রটনা শোনা গিয়েছিল, তিনি নাকি মাঠে জল নিয়ে যেতে অস্বীকার করেছিলেন এবং প্রশ্ন উঠেছিল তাঁর ব্যবহার নিয়েও। যদিও পরবর্তী সময়ে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় এরকম কোনও ঘটনার কথা অস্বীকার করেন।

এর পর এল আসল সুযোগ। টানা ডোমেস্টিক ক্রিকেটের সাফল্য তাঁকে ১৯৯৬-এ ভারতীয় দলে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করল। ইংল্যান্ড সফরে প্রথম টেস্টে তাঁর জায়গা হয়নি। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টের আগে অধিনায়ক আজহারউদ্দিনের সঙ্গে সমস্যা হওয়ায় সফর ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন নভজ্যোৎ সিং সিধু। আর সুযোগ এসে যায় সৌরভের সামনে। সুযোগ পেয়েই চার বছর ধরে অপেক্ষা করার জবাবটা দিয়ে দেন সৌরভ। অভিষেই সেঞ্চুরি (১৩১)। দ্বিতীয় টেস্টে আবার সেঞ্চুরি (১৩৬)। সচিনের সঙ্গে ২৫৫ রানের পার্টনারশিপ করেন যেটা সেই সময়ের সর্বোচ্চ ছিল।

পরের বছরই একদিনের ক্রিকেটেও অভিষেক হয়ে যায় সৌরভের। সেই বছরের শেষে টানা চারটি ম্যাচের সেরার পুরস্কার তুলে নেন তিনি। ব্যাটে বলে ততদিনে দাপট দেখাতে শুরু করে দিয়েছিলেন দাদা। সাহারা কাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১০ ওভারে ১৬ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট নেন তিনি। এটাই তাঁর সেরা বোলিং।

১৯৯৯ বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে তাঁর ১৫৮ বলে ১৮৩ রানের এসই বিধ্বংসী ইনিংস আজও মনে রেখেছেন তাঁর ফ্যানরা। ২০০০-এ যখন ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারীকে জর্জরিত গোটা ভারতীয় ক্রিকেট তখন দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। শরীরের কারণ দেখিয়ে সেই সময় দায়িত্ব ছাড়েন সচিন তেন্ডুলকর। তাঁর হাত ধরেই কঠিন সময় থেকে ঘুরে দাঁড়ায় ভারতীয় ক্রিকেট।

আরও একটা জিনিস ভারতীয় ক্রিকেটকে শেখান সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, আর সেটা হল প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে লড়াই করা। তাঁর অধিনায়কত্বে ভারত প্রথম খেলতে নামে আইসিসি নক-আউট ট্রফিতে। কিন্তু ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরে যেতে হয়। ফাইনালে তাঁর ব্যাট থেকে আসে সেঞ্চুরি।


  • জন্ম: ৮ জুলাই ১৯৭২
  • উচ্চতা: ৫ ফিট ১১ ইঞ্চি
  • ব্যাটিং: বাঁ হাতি
  • বোলিং: ডানহাতি
  • টেস্ট অভিষেক: ২০ জুন ১৯৯৬ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে
  • শেষ টেস্ট: ৬ নভেম্বর ২০০৮ অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে
  • ওডিআই অভিষেক: ১১ জানুয়ারি ১৯৯২ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে
  • শেষ ওডিআই: ১৫ নভেম্বর ২০০৭ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে
  • অন্যান্য দল: বাংলা, ল্যাঙ্কাশায়ার, গ্ল্যামারগন, নর্দাম্পটনশায়ার, কলকাতা নাইট রাইডার্স, পুণে ওরিয়র্স
  • মোট টেস্ট: ম্যাচ ১১৩, রান ৭২১২, উইকেট ৩২
  • মোট ওডিআই: ৩১১, রান ১১,৩৬৩, উইকেট ১০০

এর পর শুরু হয় ভারতীয় ক্রিকেটারদের প্রতিপক্ষকে পাল্টা দেওয়ার পালা। একটা সময় ছিল যখন ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার স্লেজিংয়ের ভয়ে জুজু হয়ে থাকতেম ভারতের ক্রিকেটাররা। এবার পাল্টা দিতে শুরু করেন সৌরভ ও তাঁর হাতে তৈরি দল। সে ফ্লিনটফের ভারতের মাটিতে জার্সি ঘোরানোর পাল্টা তিনি দেন লর্ডসের ব্যালকনিতে ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি জিতে। ২০০১-ও ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয়ের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক স্টিভ স্মিথকে টসের জন্য অপেক্ষা করিয়ে তাঁকে বুঝিয়ে দেন আমরাও পারি।

তাঁর হাত ধরে উঠে আসা যুবরাজ সিং, মহম্মদ কাইফ, হরভজন সিং, জাহির খান, আগরকররা দাপট দেখাচ্ছেন। আর এই দল নিয়েই ভারতকে ২০০৩-এর বিশ্বকাপ ফাইনালে তোলেন সৌরভ। ১৯৮৩-র পর সেই প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছনো ভারতের। ফাইনালে্ অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারতে হয় ভারতকে। ততদিনে সৌরভের অধিনায়কত্ব সেরার তকমা পেয়ে গিয়েছে।

২০০৫-এ খারাপ ফর্মের জন্য বাদ পড়তে হয় তাঁকে। অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পান রাহুল দ্রাবিড়। সেই সময় ভারতের কোচ গ্রেগ চ্যাপেলের সঙ্গে তৈরি হয় সমস্যা। প্রকাশ্যে চলে আসে দু’জনের ঝামেলা। লিক হয়ে যায় বোর্ডকে করা চ্যাপেলের ই-মেল। যেখানে তিনি সৌরভকে নেতৃত্বের অযোগ্য বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন। আগুন জ্বলে যায় গোটা দেশে এই খবরে।

২০০৬-এ যখন ভারতীয় ক্রিকেট দলের খুব খারাপ অবস্থা তখন আবার ডাক পড়ে সৌরভের। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সেই সিরিজ ভারত হেরে গেলেও সর্বোচ্চ রান নিয়ে ফেরেন সৌরভ। এর পর একদিনের ক্রিকেটে শ্রীলঙ্কা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সিরিজে ফেরেন, শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে সিরিজের সেরাও হন।

২০০৭ বিশ্বকাপে রাহুল দ্রাবিড়ের নেতৃত্বে ভারতীয় দলের ভরাডুবি হয়। সেই দলে ছিলেন সৌরভ। বাংলাদেশের  কাছে হেরে বিদায় নেয় ভারত। আবার প্রশ্ন ওঠে চ্যাপেলকে নিয়ে এবং সিনিয়র প্লেয়ারদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে। বিদায় হয় তাঁর। ২০০৭-এ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কেরিয়ারের একমাত্র ডবল সেঞ্চুরিটি করেন সৌরভ। শেষ টেস্টের প্রথম ইনিংসে তিনি ২৩৯ রান করেন। সেই বছর দ্বিতীয় সবোর্চ্চ রান করেন তিনি জ্যাক কা‌লিসের পর। ২০০৮-এ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। ততদিনে ভারতের অধিনায়কত্ব পেয়েছেন এমএস ধোনি।  কয়েক বছর আইপিএল-ও খেলেন প্রথমে কেকেআর এবং পরে পুণের হয়ে।

এর পর প্রশাসনে আসাটা তাঁর জন্য ছিল সময়ের অপেক্ষা। বাংলা ক্রিকেটের দায়িত্ব তুলে নেন তিনি নিজের কাঁধে জগমোহন ডালমিয়ার অবর্তমানে। ২০১৫ থেকে অক্টোবর ২০১৯ পর্যন্ত বাংলার ক্রিকেটের মসনদ সামলানোর পর এখন দেশের ক্রিকেটের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি। বিসিসিআই-এর সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের সময়েই প্রথম গোলাপি বলের ক্রিকেট খেলেছে ভারতীয় দল ইডেন গার্ডেনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। এবার সামনে আইসিসি। বিশ্ব ক্রিকেটেও একদিন দাপট দেখাবেন বাংলার দাদা।

(নিজের প্রিয় মুহূর্তকে ফিরে দেখতে ক্লিক করুন এখানে)

(জাস্ট দুনিয়ার ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন)