কোভিড কালে কেন আইপিএল, প্রশ্নটা উঠতে শুরু করেছে—কিন্তু কেন নয়?

কোভিড কালে কেন আইপিএল

কোভিড কালে কেন আইপিএল? প্রশ্নটা যে আরও অনেকের মনে আসেনি তা নয়। কিন্তু প্রতি সন্ধেয় চার ঘণ্টা সত্যিই তো ভালভাবে কাটছে মানুষগুলোর। শনি-রবিতে সেটা আট ঘণ্টা। গোটা দিন ধরে যেভাবে দেশের মৃত্যু মিছিল, অক্সিজেনের হাহাকার, করোনার বাড়বাড়ন্ত— মানসিকভাবে আমাদের আরও দুর্বল করে দিচ্ছে তাতে একটু স্বস্তি দিচ্ছে ওই ক্রিকেট। শুধু কি তাই? আরও অনেক কিছু জরিয়ে রয়েছে এই খেলার সঙ্গে। আর তা হল হাজার হাজার মানুষের রুটিরুজিও, লিখলেন সুচরিতা সেন চৌধুরী


ক্রিকেট কি শুধুই একটা খেলা? তার পর আবার আইপিএল। এক কথায় এন্টারটেইনমেন্ট। কিন্তু যাই হোক না কেন, দেশের মাটিতে এই আইপিএল কত মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে আমাদের কাছে তার হিসেব নেই। সাধারণ মানুষ ড্রয়িংরুমে বসে মনকে শান্ত করছে ক্রিকেট দেখে। এটা না হলেও চলত। কিন্তু যেটা না হলে চলত না সেটা হল এই খেলার সঙ্গে থাকা মানুষগুলোর বেঁচে থাকা, খেয়ে-পরে থাকা।

গত বছর আইপিএল চলে গিয়েছিল বিদেশে। হয়নি ঘরোয়া কোনও টুর্নামেন্ট। যে মানুষগুলো মাঠে কাজ করে। গ্যালারি থেকে ড্রেসিংরুম, ফ্লাডলাইট থেকে ক্যাটারার, আরও অনেক অনেক কিছু কাজ রয়েছে পুরো একটা ইভেন্টকে ঘিরে। সারা বছর এক সঙ্গে অনেকটা টাকা পাওয়ার উদ্দেশে বসে থাকেন কত মানুষ, কত ছোট, বড় সংস্থা। সারা বছর তো আর কিছু থাকে না। শুধু কী তাই ট্র্যাভেল থেকে হোটেল ইন্ডাস্ট্রিও যুক্ত রয়েছে এর সঙ্গে। যেগুলোর ব্যবসা তলানিতে এসে দাঁড়িয়েছিল গত বছর। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সব হোটেল। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বিমান ওঠা-নামা। কার ক্ষতি হয়েছিল তাতে? যে মানুষগুলো এই ইন্ডাস্ট্রিতে চাকরি করে, মাস গেলে মাইনে পায়, তাঁদের। কারও চাকরি গিয়েছে তো কারও মাইনে অর্ধেক হয়ে গিয়েছে।

তৈরি হচ্ছে ব্যাট

এবার আসি সেই সব সংস্থার কথায় যারা জুতো, জার্সি, হেলমেট, ব্যাট, বলসহ খেলার সরঞ্জাম তৈরি করে—তারাও তো হাত, পা গুটিয়ে বসে ছিল এতদিন। এক একটা ইভেন্ট থেকে এই সংস্থাগুলো কোটি কোটি টাকা লাভ করে। আমরা শুধু বাইরে থেকে পুমা, অ্যাডিডআস, রিবক দেখতে পাই। এর পিছনের কাহিনিটা অনেক বড়। এই জিনিসগুলো কারা তৈরি করে, কোথায় তৈরি হয়, তাদের রোজগারের রাস্তাও তো এই খেলাই। এই বড় সংস্থার নামের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে অনেক ছোট ছোট সংস্থা। তাদেরও তো বাঁচতে হবে।

গত বছর যখন কোভিডের জন্য সব বন্ধ, তখন কাজ হারিয়েছিলেন কত কত মানুষ। শুধু মাত্র ক্রিকেটের সঙ্গে জুড়ে থাকা, মাঠের সঙ্গে জুড়ে থাকা কত মানুষ রয়েছে এই তালিকায়। সেই সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন অনেক ক্রিকেটার। কিন্তু সেটা তো সমাধান হতে পারে না। শুধু কী মাঠে, গ্যালারিতে, ক্যাটারিংয়ের কাজ করা মানুষগুলো উপকৃত হচ্ছেন? না ক্রিকেটারদের কথা ভাবুন তো। এমন অনেক ক্রিকেটার রয়েছেন যাঁরা সারা বছর এই একবার রোজগার করেন মোটা টাকা। যাঁদের পিছনে বিসিসিআই-এর কোটি কোটি টাকার চুক্তি নেই। ঘরোয়া ক্রিকেটেই বা টাকা কোথায়? তাঁরাও তো উপকৃত হচ্ছেন।

ক্রিকেট একটা সময় বড় লোকের খেলা ছিল। বেশি না খেললেনও চলে যেত। কিন্তু এখন আর তেমনটা নেই। অনেক প্রতিভাবাণ গরীব ছেলে তাঁদের পারদর্শীতায় নজর কেড়ে নেন। গরীব ঘর থেকে অনেক লড়াই করে উঠে এসে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে ক্রিকেট জার্সি পরেছে ছেলেটি। তাঁদের কী করে চলবে? একটা খেলার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে প্রচুর ইন্ডাস্ট্রি। আর সেই ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জুড়ে রয়েছে অজস্র মানুষ। একটা গোটা টেলিভিশন চ্যানেল। সত্যি খেলা না থাকলে কী দেখাবে টিভি। আর টিভিতে দেখানোর কিছু না থাকলে সেখানে কাজ করা মানুষগুলো কোন কাজে লাগবে? চাকরি যাবে তাঁদের। গত বছর অজস্র সংবাদকর্মীর চাকরি গিয়েছে। যাঁদের বেশিরভাগ এখনও বেকার।

ক্রিকেট আসলে শুধু খেলা নয়। ক্রিকেট একটা ইন্ডাস্ট্রি যার সঙ্গে জুড়ে ছোট,বড় একগুচ্ছ ইন্ডাস্ট্রি। আর সেই সংস্থাগুলো হাজার হাজার মানুষের রুটি-রুজি। যদি সব সরকারি, বেসরকারি অফিস খোলা থাকে তাহলে ক্রিকেট কেন হবে না? এই যে প্রতিদিন লোকাল ট্রেন, বাস, অটোতে ঠাসাঠাসি করে অফিস যাচ্ছেন। অফিসে গিয়ে অনেক মানুষের সঙ্গে পাশাপাশি বসে কাজ করছেন—তাতে তো দোষ নেই। আসলে ওটা আপনার রুটি-রুজি। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও দেশে লকডাউন হচ্ছে না, কারণ তাহলে মানুষের বাঁচার রাস্তা আরও হারিয়ে যাবে, অর্থনীতি ডুবে যাবে। তাহলে ক্রিকেট নয় কেন?

মাঠ তৈরিতে ব্যস্ত কর্মীরা

যদি চোখ, কান খুলে রাখা যায় তাহলে দেখা যাবে ক্রিকেটটাই সব থেকে সাবধানে হচ্ছে। স্টেডিয়ামে কোনও দর্শক নেই। কারও হোটেলের বাইরে যাওয়া নেই। যাঁরা মাঠে নামছেন তাঁরা এক জায়গায়, এক সঙ্গে থাকছেন, নিরাপত্তার জন্যই। তাঁদের জন্য রয়েছে বায়োবাবল ব্যবস্থা। তা বলে কী তাঁদের কোভিড হয়নি? হয়েছে। অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু আরও একটা বছর! না, সম্ভব ছিল না। কোটি টাকার প্লেয়ারদের না দেখে তার পিছনের বিপুল পরিমাণের কর্মযজ্ঞটা দেখুন প্লিজ।

কুম্ভমেলা আর ভোট উৎসব যদি হতে পারে তাহলে ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, টেনিস, কুস্তি, ব্যাডমিন্টন— কেন নয়? আসলে দরকার সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা আর প্রশাসনের সচলতা। সেটারই বড় অভাব।

(প্রতিদিন নজর রাখুন জাস্ট দুনিয়ার খবরে)

(জাস্ট দুনিয়ার ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন)