সচিন তেন্ডুলকর: স্বপ্নের নায়কের ৪৬-এ ফিরে যাওয়া ছোটবেলায়

সচিন তেন্ডুলকরসচিন তেন্ডুলকর: ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ের পর...

হিন্দোল পালিত


সে সব একদম পুঁচকে বেলার কথা। নার্সারিতে পড়ি হয়তো। খুউব আবছা মনে পড়ে বাবা সক্কাল থেকে উঠে টিভির অ্যান্টেনা নিয়ে পড়েছিল। বিকেল হতে বাড়িতে ভিড়। রাতে উচ্ছ্বাস। রাস্তায় প্রচুর লোক। অনেক পরে বুঝেছিলাম, সে ছিল হিরো কাপের সেমিফাইনালের রাত। ম্যাকমিলানকে এক ওভারে ছয় রান করতে না দিয়ে জাতীয় নায়ক হয়ে গিয়েছিলেন কোঁকড়া চুলের এক সদ্য তরুণ।

এর পর ক্লাস ওয়ান। ভারতে ক্রিকেট বিশ্বকাপের উত্তেজনায় সবাই বুঁদ। সেমিফাইনাল একটা শনিবার। স্কুলে হাফ ছুটি। বাড়িতে ঠাসা ভিড়। অথচ বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামতেই যাবতীয় উচ্ছ্বাস, উত্তেজনা এক লহমায় কে যেন ব্লটিং পেপারে শুষে নিল। ট্রাফিক লাইটের লাল আলোটার মতো একটা বাল্ব জ্বলে উঠতেই ব্যাট বগলে করে হাঁটা লাগালেন সচিন।প্রথম মোচড় খেল আমার শিশু হৃদয়।

সেই শুরু। সেই প্রি-ইন্টারনেট, মোবাইলহীন সময়ে আমরা সচিনে বুঁদ হয়ে বাঁচতাম। টিউশন থেকে বেরিয়ে যদি টিভির দোকানের সামনে ভিড় দেখতাম, বুঝতাম ক্রিজে সচিন আছেন। নয়তো চারপাশটা নিঝুম হয়ে থাকত। জোর করে মা-বাবা ক্লাসিকাল সঙ্গীত শুনতে নিয়ে গিয়েছে। আমার মন পড়ে রয়েছে সাউথ আফ্রিকায়। ভারতকে ফাইনালে উঠতে হলে জিম্বাবোয়েকে বড় ব্যবধানে হারাতে হবে। প্রোগ্রাম শেষে বাইরে বেরিয়ে শুনি সচিন এড ব্রন্দেজ, হিথ স্ট্রিককে প্রবল পিটিয়ে ফাইনালে নিয়ে গিয়েছে। বেশ মনে আছে, সুদামার রোলের দোকানের সামনে হাত-পা ছুঁড়ে নেচেছিলাম। মা-বাবা বিস্ফারিত চোখে সে দিকে তাকিয়ে ছিল।

কখনও আবার এমনও হয়েছে, ভারত অস্ট্রেলিয়া টেস্টের প্রথম দিন ভারত আগে ব্যাট করছে। আমি স্কুল কামাই করে বাড়ি বসে আছি। সচিন শুরু করলে‌ন চার দিয়ে। কিন্তু ওই ওভারেই কাট করতে গিয়ে ওয়ার্নের বলে ফার্ষ্ট স্লিপে আউট। সেকেন্ড ইনিংসে স্কুল গেলাম। খবর পেলাম ওয়ার্নকে পিটিয়ে চৌচির করে দিয়েছেন। রাত সাড়ে ১০টায় তখন হাইলাইটস দেখাত।

কোচ রমাকান্ত আচরেকর, বন্ধু ব্রায়ান লারা ও স্ত্রী অঞ্জলির সঙ্গে সচিন।

বাড়িতে কেবল লাইন ছিল না। তাই ওভারসিজ খেলা হলে মামাবাড়ি যেতাম। সেই বিখ্যাত শারজা ঝড়। খেলা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমার পাঁড় কমিউনিস্ট দাদু ভীষণ ক্রিকেট খেলাবিরোধী। কিছুতেই রাত জেগে খেলা দেখতে দেবে না। কিন্ত দিদুন ভীষণ সচিন-পন্থী। তাই তাঁর ফরমান: ‘‘যত ক্ষণ দাদুভাই ব্যাট করছে, টিভি চলবে।’’ টিভি চলল, পাশাপাশি চলল ব্যাটও। ক্যাসপ্রইচ, ফ্লেমিংকে মারা বড় বড় ছয়গুলো সব মাঠের বাইরে পড়ল।

এর পর ১৯৯৯ বিশ্বকাপ। পাড়াতে রবীন্দ্রজয়ন্তী হবে। আমি করব মুকুট নাটকে রাজধরের পার্ট। হটাৎ শুনলাম, সচিন নাকি জিম্বাবোয়ে ম্যাচ খেলবেন না। বাবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য তিনি দেশে ফিরে গিয়েছেন। সে দিন রিহার্সালে একটা লাইনও ঠিক বলতে পারিনি। নিউজিল্যান্ডে খেলা হলে কাকভোরে উঠতে হয়। সব ম্যাচই দেখি। সচিনের ভয়াবহ খারাপ ফর্ম। গড় একেরও নীচে। এই অবস্থায় ওয়ার্ল্ড কাপ গেল। আক্রম-শোয়েবকে কী বিষম পিটুনিটাই না দিলে‌ন।

আমি বড় হচ্ছি। সচিনের শরীরেও জমছে ক্লান্তি। টেনিস এলবো বেশ ভোগাচ্ছে তাঁকে। ব্যাটিংয়ের আক্রমণাত্মক ভাবটুকু কিঞ্চিৎ ম্রিয়মাণ। চ্যাপেল সাহেব সৌরভকে বাদ দিয়েছেন। সচিন নাকি হিটলিস্টের পরের নাম। এ রকম অবস্থায় একদম বিশ্বকাপের আগে আগে বিশাখাপত্তনমে একটি ওডিআইতে সচিন-ধোনি ব্যাট করছেন। ধোনি তখন ফর্মের শীর্ষে। খেলা স্লগ ওভারে পৌঁছে গিয়েছে। সচিন দুটো বল মিস করার পর ধোনি এগিয়ে এসে সম্ভবত স্ট্রাইক রোটেট করার কথা বললেন। পরের বলটা গিয়ে পড়ল স্টেডিয়ামের বাইরে। নতুন করে ভালবাসলাম সচিনকে।

বিশ্বকাপে দিলহারা ফার্নান্দোর একটা নেমে যাওয়া বল যখন সচিনের স্টাম্প ছিটকে দিল, ভাবলাম এই শেষ। এর আগে আসিফ স্টাম্প ভেঙে দিয়েছে। খোদ তেন্ডুলকরের শহরের কাগজ হেডলাইন করেছে: এণ্ডুলকর। কিন্ত কোথায় কী? সচিন যেন নতুন উদ্যমে খেলতে শুরু করল। একের পর এক বড় স্কোর। আয়ারল্যান্ডের মাটিতে সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে, ইংল্যান্ডের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিরূদ্ধে, মোহালিতেে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে— সেই স্ট্রেট ড্রাইভ, হুক, পুল, কাটের পুরনো সচিন।

খেলার আরও খবরের জন্য ক্লিক করুন এই লিঙ্কে

ভিবি সিরিজের প্রথম ফাইনাল একা জেতালে‌ন। পরের ফাইনালটাতেও ৯০। দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিরাট, প্রায় চারশো ছুঁই ছুঁই টার্গেটের সামনে ১৭৭ করলেন। স্টেনের বিরুদ্ধে ২০০ করার দিন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার তাড়ায় জীবনে প্রথম ও শেষ বারের জন্য ট্রেনে টিকিট না কেটে ফাইন দিলাম।

ইডেনে ভারত-শ্রীলঙ্কা ম্যাচের প্রাক্টিসে শুধু সচিনকে দেখব বলে পাশহীন আমি টানা দু’ঘণ্টা ওয়াশরুমে লুকিয়ে ছিলাম। দোসরা এপ্রিল যে দিন ওঁর হাতে কাপটা উঠল, বুঝলাম চাওয়া-পাওয়ার শেষ বৃত্তটুকু মিলে গেল।

জাস্ট দুনিয়ার ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন

সেই বাল্যকাল থেকে সচিন, তাঁর এমআরএফ ব্যাট, কোঁকড়ানো চুল, অ্যাবডমেন গার্ড ঠিক করা, ক্যাচ ধরে হাত তোলা, বল করতে এসে বালা ঘোরানো— সব আমার সঙ্গী। যখন সচিন থামলেন, তখন সদ্য কলেজে পড়াতে ঢুকেছি। বেশ মনে আছে, উদাস মনে ক্লাস নিচ্ছি। সৌভিক ফোন করল। কাঁদছে। বাড়ি এসে ইউটিউবে ফেয়ারওয়েল স্পিচটা শুনছি। মনে আছে, পরবর্তী বেশ কিছু মাস ক্রিকেট খেলাই দেখিনি। খেলা দেখার আসল লোকটাই তো চলে গিয়েছিল। ভাগ্যিস ইস্টবেঙ্গল জীবনে ছিল। নয়তো সারভাইব করাই মুশকিল হত।

এ জীবনে অজস্র ক্রীড়াবিদকে ভালবেসেছি। কাউকে মাঠে বসে দেখেছি, কাউকে টিভির পর্দায়। কিন্ত সচিনের মতো এত নিবিড় সম্পর্ক, এত ব্যক্তিগত সম্পর্ক, এত রাগ-অনুরাগের সম্পর্ক আর কারও সঙ্গে হয়নি।

সচিন আমাদের সক্কলের হারিয়ে যাওয়া সময়ের শেষ এসটিডি বুথ, যেখানে হৃদয়ের টেলিফোনটা বাজতেই থাকবে।

আইপিএল ২০১৯ ফাইনাল ১২ মে চেন্নাই থেকে সরে হায়দ্রাবাদে

Be the first to comment on "সচিন তেন্ডুলকর: স্বপ্নের নায়কের ৪৬-এ ফিরে যাওয়া ছোটবেলায়"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*