কাবুলের সঙ্গে ভয়-ভাবনার প্রেমের ছ’মাস

কাবুলের সঙ্গেরুক্ষ্ম পাথরের মরুভূমির মাঝে ঘন নীল লেক।

জয়ন্ত দত্ত


কাবুলের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মিনি সেই যে ছোটবেলায় ‘কাবুলিওয়ালা’র হাত ধরিয়ে দিয়েছিল!

কিন্তু, বড় হয়ে সেই পাল্টে যাওয়া কাবুলেরই অন্য পরিচয় পেয়েছি খবরের কাগজে। ছোটবেলাটাকে মেলাতে পারিনি। কাবুল যাওয়ার ইচ্ছেটা যদিও তাতে একফোঁটা চলে যায়নি কোনও ভাবে।

অনেকটা বড় হওয়ার পর সেটা ২০০৮ সা‌ল। কর্মসূত্রে তখন মুম্বইতে রয়েছি। কাজের সুবাদেই এ দিক ও দিক যেতেও হয়। কয়েক দিন আগেই একটা বিদেশ সফর সেরে ফিরেছি। বেশ জটিল একটা সমস্যা সামলে এসেছি বলে বসও বেশ খুশি। ফিরতেই জানিয়ে দিয়েছেন, সপ্তাহখানেকের মধ্যে ফের যেতে হবে। কিন্তু, কোথায়? সেটা যদিও তখনও বলেলনি। অধীর আগ্রহে বসে রয়েছি।

দিন তিনেক পরে এক দিন বস নিজের চেম্বারে ডেকে পাঠালেন। যেখানে যেতে হবে বললেন, শুনে প্রথমেই যেন একটা ধাক্কা খেলাম! আফগানিস্তান! এ রকম একটা সময়ে ওখানে আমাকে প্রাণ হাতে নিয়ে পাঠানোর মানেটা কী! বুঝতে পারছিলাম না। জিজ্ঞাসাও করা যায় না এ সব অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে। আমার হতভম্ব মুখটা দেখে বসও আর কিছু বললেন না।

নিজের ভেতরে ভয় নিয়েই মুম্বই থেকে রওনা দিলাম। দিল্লি হয়ে যাওয়া। রাঝধানী শহর থেকে সকাল ৮টার বিমানে চড়ে বসলাম। কিছু ক্ষণ পরেই নীচে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম! হিন্দুকুশ রেঞ্জের উপর দিয়ে চলেছি। কোনও বিশেষণই খুঁজে পাচ্ছি না। হাত নিশপিশ করছে! একটা ছবি তোলার জন্য। কিন্তু বিমানে ওঠার পর থেকেই বার বার বলে দেওয়া হয়েছে, পুরো বিমানসফর তো বটেই, বিমান থেকে নামার পরেও ফোটো তোলা এক্কেবারে নিষিদ্ধ। পুরো পথটাই তাই কাচের জানলার বাইরে চোখ রেখে গেলাম। মনোমুদ্ধকর ছবিগুলো ধরে রাখলাম মন-ক্যামেরায়।

কাবুলের সঙ্গে

বিমানবন্দরে নেমে ইমিগ্রেশন ক্লিয়ার করার পর চার জন ষণ্ডামার্কা ‘হ্যান্ডলার’ অর্থাৎ ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে বেরোলাম। কোনও জায়গায় গেলে যাওয়ার আগে আমি সেখানকার স্থানীয় ভাষায় কয়েকটা শব্দ জেনে যাওয়ার চেষ্টা করি। এটা অচেনা ওই জায়গায় কথাবার্তা চালাতে খুব কাজে দেয়।

ধানফুলের গন্ধ মাতাল করে স্বপ্ন দেখার এই খামারবাড়িতে

আফগানিস্তানের চালু দুটো ভাষা দারি এবং পশতু-তে কিছু শব্দ লিখে রেখেছিলাম। মাঝেমাঝেই চোখ বুলিয়েছি তাতে। ওই শব্দেরই কয়েকটা দিয়ে আলাপ করা শুরু করলাম আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে। অনেক ক্ষণ সিগারেট খাওয়া হয়নি। এয়ারপোর্টে তো লাইটারটা পর্যন্ত জমা রেখে দিয়েছে! আকারে ইঙ্গিতে দু’একটা ওদের পরিচিত শব্দে এটাই বোঝানোর চেষ্টা করলাম। আমার ভুল উচ্চারণ শুনে ওরা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। বাড়িয়ে দিল সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার।

এ বার আমার প্রথম কোনও বুলেটপ্রুফ গাড়িতে ওঠার পালা। তখনও জানি না ওটা বুলেটপ্রুফ। গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে একটা ক্ষতচিহ্ন দেখে জিজ্ঞেস করলাম, ওটা কী? জানা গেল, গুলির দাগ! চমকে গেলাম ভেতরে ভেতরে। মুখের উপর সেই চমকানো ব্যাপারটা ফুটে উঠল কি না কে জানে! এক জন নিরাপত্তারক্ষী বললেন, ‘‘ভয় নেই এটা তো বুলেটপ্রুফ গাড়ি।’’

এয়ারপোর্ট থেকে বেরোনোর ১০ মিনিটের মধ্যে কাবুল হাইওয়েতে ওঠামাত্র মুগ্ধ হয়ে গেলাম। রাস্তা যেন সোজা বরফঢাকা পাহাড়ে উঠে যাচ্ছে। গাড়ি থেকে ছবি তুললাম। ছবিগুলো বাজে আসছিল। কাচ নামিয়ে ছবি নেবো কি না জানতে চাইতে জবাব এল, গাড়িতে থাকলে কাচ নামানোটা এক্সপ্রেসওয়েতে খুব বিপজ্জনক। কারণ, এই রাস্তায় দিনে ২০০ রাউন্ড গুলি চলাটা নাকি খুবই স্বাভাবিক। আমার মনের ভেতরে তত ক্ষণে গুড়গুড় শুরু হয়ে গিয়েছে।

কাবুলের সঙ্গে

মাঝে মাঝে একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ করছিলাম। রাস্তার অনেক জায়গায় কোথাও ধারে, কোথাও বা একেবারে মাঝখানে হলুদ মার্ক করা আর ছোট মতো একটা গার্ড দেওয়া। সব গাড়ি ওই জায়গাগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করে যা উত্তর পেলাম, তাতে আক্কেলগুড়ুম হয়ে গেল। ওরা বলল যে, ওগুলো ল্যান্ডমাইন কিন্তু তোলা যাবে না। তাই মার্ক করা যাতে সবাই এড়িয়ে চলে। আমার সেলফ মোটিভেশন তত ক্ষণে তলানিতে। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ না করলে যে এ শহরে আসতে হত না! তত ক্ষণে নিজের পড়াশোনাকেও শাপশাপান্ত করতে শুরু করেছি মনে মনে।

ভয়ের সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে শহরে ঢুকে গেলাম। রাস্তার পাশে অনেক জায়গায় অনেকটা করে জায়গা জুড়ে একে একটা বাড়ির ধ্বংসস্তূপ। এগুলো যে ‘এয়ার বম্বিং’-এর চিহ্ন তত ক্ষণে বুঝে গিয়েছি। দেশে আর হয়তো ফিরতে পারব না। এমন ভাবনাও মনে মনে চলছে। অবশেষে হোটেলে এসে পৌঁছলাম। এই এলাকাটা দেখলাম পুরো পুলিশ আর সামরিক বাহিনীতে ভর্তি। হোটেলের কর্মীরাই জানালেন, এখানেই পর পর বিভিন্ন দেশের দূতাবাস। সব বাড়িতেই তাই দোতলা সমান উঁচু পাঁচিলের উপর তার লাগানো। আর চারপাশে সিকিউরিটি ঘেরা অফিসিয়াল বাংলো। ওগুলোতে বিভিন্ন কোম্পানির বিদেশি কর্মচারীরা থাকেন।

বড়ামাঙ্গওয়া, আমার ভালবাসার বারান্দা, আমার খাদের ধারের রেলিংটা

এখানে এসে কোনও বাঙালির দেখা পাব, সেটা স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু সৌভাগ্যবশত সোমনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ হল। তিনি ওই কোম্পানির চিফ টেকনোলজি অফিসার। পরের দিন অফিস, তার আগে সিকিউরিটি অফিসার এসে বুঝিয়ে গেলেন, লিফ্টে নীচে নামার আগে সিকিউরিটি অফিসারকে ফোন করতে হবে। তিনি ‘ওকে’ বললে তখনই নীচে যেতে পারব। কম্পাউন্ড ছেড়ে বেরোনোর কথা ভুলেও মনে আনতে বারণ করলেন। এ ছাড়া রাস্তায় যদি আমার সামনে বম্বিং হয়, তা হলে কাকে ফলো করব, কাকে ফোন করব ইত্যাদি নানাবিধ সতর্কতামূলক বাণী।

পর দিন থেকে অফিস গেলাম। দেখে মনে হল, ওটাকে অফিস না বলে দুর্গ বললে মনে হয় ভাল হত। যাই হোক, ডেডলাইন নিয়ে এসেছি, কাজ করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফেরত যেতে হবে দেশে।

কাবুলের সঙ্গে

শুরু হয়ে গেল কাজ। রোজ সকাল ৭টার মধ্যে রেডি হয়ে থাকতে হত। এর পর এক বা দু’জন করে গ্রুপ করে গাড়ি করে অফিস। বিকেল ৫টার মধ্যে অফিস থেকে বেরিয়ে ফের হোটেল। মাঝেমধ্যেই ভারতীয় দূতাবাস থেকে এসএমএস ঢুকত। কিছুই না, সেখানে লেখা থাকত, ওই রাস্তায় অ্যাটাক হয়েছে। ওই রাস্তা অ্যাভয়েড করো। ওই এলাকায় অ্যাটাকের সম্ভাবনা আছে। ওই এলাকা দিয়ে ফিরো না! ইত্যাদি।

সন্ধেগুলো কিন্তু বেশ ভাল কাটত ওখানে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লোকজন— ভারত থেকে ৪, পাকিস্তানের ৩, ফিলিপিন্সের ৫, লেবাননের ২ আর আমেরিকার ২ জন— এরাই ছিলাম ওই সময় একই কম্পউন্ডের বাংলোগুলোতে। অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে সবাই অফিসার্স মেসে হাজির হতাম… কয়েক পাত্তরের আড্ডা, স্নুকার বা তাস সঙ্গে বিভিন্ন খাবারদাবার। রান্না করতেন ওখানকার ২ রাঁধুনি। বড় ভাল রাঁধতেন।

আফগানিস্তান খাদ্যরসিকদের স্বর্গ হতে পারে যে কোনও দিন। ওখানে গিয়ে দুম্বা খেলাম প্রথম। ভেড়ার মতো দেখতে কিন্তু কোমরের পিছন দিকে একটা অংশ মাংস আর চর্বি মেশানো যেটা কেটে নিলে আবার গজিয়ে যায়। সেই চর্বি-মাংস রান্না হয় মাখন আর লঙ্কা দিয়ে। সঙ্গে দেড় ফুট লম্বা হাতে তৈরি মোটা মোটা আফগান রুটি। উফস!

আফগানিস্তান যাওয়ার আগে জানতাম না যে, ওখানকার তাপমাত্রা মাইনাস চার ডিগ্রি পর্যন্ত চলে যায়! আমি থাকাকালীন অতটা যায়নি, কিন্তু ঝোড়ো বৃষ্টি আর কনকনে পাথুরে ঠান্ডা ভালই পেয়েছি। অবশ করে দেওয়া একটা ঠান্ডা। দিনের বেলা ১০টার পর কিন্তু রোদ্দুর খুব চড়া। কিন্তু বেশি গরম পড়লেই দেখি কিছু ক্ষণের মধ্যে শিলাবৃষ্টি শুরু করে যায়। রোদ্দুরের মধ্যে শীল পড়ছে! সঙ্গে হালকা বৃষ্টি! ব্যস চার পাশ সাদা হয়ে গেল আর সেই সঙ্গে কনকনে ঠান্ডা।

কাবুলের সঙ্গে

ওখানে দেখলাম সবাই টফি দিয়ে চা মানে কাবা খায়। শুকনো চা, সঙ্গে শুকনো আদা কাপে দিয়ে গরম জল দিয়ে দেয়, হালকা সবজে, অনেকটা গ্রিন-টির মতো। কিন্তু গ্রিন-টি নয়। লোকজন সারা দিন ওই কাবা আর টফি খেয়ে চলেছে, সেই টফি আবার গ্রিন আপেলের মতো খেতে। বেশ লাগতো কিন্তু!

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অন্য যে কোনও দেশকে টেক্কা দিতে পারে আফগানিস্তান। রুক্ষ্ম পাথুরে পরিবেশ ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়াতে দারুণ পর্যটনকেন্দ্র হতে পারত। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি যেটা প্রায় দুটো প্রজন্মকে শিক্ষা থেকে দূরে রেখেছে। যারা পেরেছে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছে। আর যারা পারেনি, তারা প্রতি দিন টিকে থাকার, বেঁচে থাকার যুদ্ধ করে চলেছে।

আমার গাড়ির চালক ছিলেন আহমদ। আমার খুব ভাল বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন। ওঁর থেকেই শোনা, এখানকার বাসিন্দাদের রোজকার অনিশ্চয়তার কাহিনি… স্কুল কলেজ বছরের বেশির ভাগ সময়েই বন্ধ থাকে। যখন-তখন গুলি বোমা চলছে, কিন্তু সাধারণ নাগরিক কী করবে, কোনও দেশের সাধারণ নাগরিক কবে যুদ্ধ চেয়েছে! তাঁর কথাগুলো যে কতটা সত্যি, তার সাক্ষ্য দিত রাস্তার পাশে বিমান হানায় উড়ে যাওয়া একটার পর একটা বাড়ি। একটা দেওয়ালও দেখিনি যেখানে বুলেটের দাগ নেই! একটা রাস্তা দিয়েও যাইনি যেখানে কোনওদিন গুলি চলেনি। রাস্তায় রোজ দেখতাম, ট্রাফিক পুলিশ ট্যাঙ্কের সারি কন্ট্রোল করছে।

কিন্তু কথায় বলে না, যাই হয়ে যাক, জীবন চলতে থাকে। ওখানে প্রথম দেখলাম রাস্তার মধ্যে স্টল করে মাছ বিক্রি হয়। আমাদের এখানে যে রকম খবরের কাগজ বিক্রি হয়, সে রকম অনেকটা। এত পরিষ্কার ভাবে ফ্রেশ মাছ আমি কোথাও বিক্রি হতে দেখিনি। রাস্তার মোড়ে দোকানগুলোর সামনে তন্দুরে আফগান রুটি তৈরি হচ্ছে। পাশে তাওয়াতে দুম্বা পেশাওয়ারি বা ভেজা ফ্রাই। খুব ইচ্ছে হত নেমে গিয়ে খাই, কিন্তু ওই যে ‘স্ট্রিক্টলি প্রোহিবিটেড’!

কাবুলের সঙ্গে

প্রত্যেক সপ্তাহে আমাদের একবার গ্রসারি শপিং যে নিয়ে যাওয়া হত, সেটা একটা অনুষ্ঠান বললেও কম বলা হবে। চার পাশে ৪ জন বন্দুকধারীর পাহারায়! দোকানে ঢুকে নিজের পার্সোনাল ব্যবহার সামগ্রী, সঙ্গে রুমে নিজের কাছে রাখার জল, চকোলেট, সিগারেট ইত্যাদি… অফিস থেকে বাংলোয় ফেরার পথে মাঝে মাঝে এই দোকানে যাওয়াটা একমাত্র সময়, যখন আমরা অফিস বা বাংলো কম্পাউন্ডের বাইরের মাটিতে পা রাখতে পারতাম!

ওখানে আর একটা সমস্যা ছিল— চুল কাটানো। দাড়িটা নিজে ম্যানেজ করা গেলেও চুল তো নিজে ম্যানেজ করা যায় না! উইকেন্ডে দু’জন নাপিত আসতেন। যাঁরা এসে চুল কেটে দিতেন। কিন্তু, তাদের কাছে না থাকত কাঁচি, না কিছু! শুধু ট্রিম্মার ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ভেতরে আসা বারণ! নিজের লুক দেখে নিজেই অবাক হয়ে যেতাম!

উইকেন্ডগুলো বেশ মজায় কাটত! বৃহস্পতিবার সন্ধে মানেই পার্টি। সবাই মিলে গান, হুল্লোড়… সবাই ফোর্সড ব্যাচেলর… আর তো কিছু করার নেই। সবাই মিলে গল্প আড্ডায় বেশ কেটে যেত! সবাই নিজের দেশ, নিজের পরিবার নিয়ে কথা বলত। সকলে বলত, আমার দেশে ঘুরতে এসো। আর আমরাও প্ল্যান বানাতাম। ঘোরার ইচ্ছেটা বাড়ত। শুক্র আর শনিবার সকালে কম্পাউন্ডের ভেতরে ক্রিকেট খেলা হত। আর সেখানেও সব সময় ইন্ডিয়া আর পাকিস্তান— এই দুটো নামেই টিম তৈরি হত। রাঁধুনি থেকে সিকিউরিটি গার্ড— সবাইকে নিয়ে টিম। দারুণ মজা হত। বাড়ি থেকে, প্রিয়জনদের থেকে দূরে থাকা আমরা সবাই এ ভাবেই মজা খুঁজে নিতাম।

কাবুলের সঙ্গে

মাঝে মাঝে গুলির আওয়াজ বা বম্বিং-এর আওয়াজ হলেই, খেলা বন্ধ, সবাইকেই নিজের রুমে বা মেসে চলে আসতে হত। কখনও পড়ন্ত বিকেলে পাঁচিলের উপরে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে আসা কমলা আলোয় মন খারাপ হত। একা লাগতো। মনে প্রশ্ন জাগত: এত যে যুদ্ধ হচ্ছে, তাতে কাউকে তো খুশি বলে মনে হচ্ছে না, তা হলে যুদ্ধ করে লাভটা কী হচ্ছে?

কয়েক সপ্তাহ থাকার পর যখন রোজ রোজ কাবাব, পোলাও খেয়ে খেয়ে মুখ মেরে যাচ্ছে একটু বাঙালি খাবার খেতে ইচ্ছে করছিল। আড্ডায় এক দিন কথায় কথায় জানালাম যে, আমি রান্না করতে ভালবাসি। আর কিছু একটা বানাতে চাই। সবাই দেখলাম বেশ খুশি হল নতুন ডিশ টেস্ট করার আশায়। ওখানে দু’জন কুকের সঙ্গে ঢুকে পড়লাম কিচেনে। বেশ কষিয়ে গোলবাড়ি টাইপ মটন কষা— দেশ বিদেশ নির্বিশেষে সবাই পারলে তখনই আমায় রাঁধুনির চাকরি দিয়ে দেয় আর কি… আরও জানলাম যে ওখানে পোস্ত খুব সস্তা। মানে তিরিশ টাকা কেজি। অথচ ওখানে খাবারে পোস্ত সে রকম ভাবে ব্যবহার হয় না। ব্যস আর পায় কে! বাঙালি পোস্তর স্বাদ পেলে আর থাকে কী করে? ব্যস… প্রথমে আলু পোস্ত বানিয়ে খাওয়ালাম সবাইকে… এর পর হাতের পাতার সাইজের পোস্তর বড়া, টোম্যাটো পোস্ত, চিকেন পোস্ত— কিছুই বাদ দিইনি। সবাইকে মোটামুটি যত টাইপের পোস্তর পদ হয়, সব খাইয়ে ছেড়েছি! মাঝে মাঝে বেশ টুকটাক ডিশ বানাতাম ওখানে। এমনকি, ওখানকার কুকদের এগরোল অব্দি বানানো শিখিয়ে এসেছি!

কাবুলের সঙ্গে

প্রায় ৫ মাস এ ভাবেই কেটে গেল। অফিসের যে কাজের জন্যে এসেছিলাম, সেটাও প্রায় শেষের মুখে! কিছু দিন পরেই অফিসিয়াল লঞ্চ সেরে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু তখনও পর্যন্ত এক দিনও বাইরের লোকাল খাবার খাওয়া হয়নি। এক দিন একটা দুঃসাহসের কাজ করেই ফেললাম। পরে বুঝেছিলাম যে ওটা করা মোটেই উচিত হয়নি। এক দিন অফিস থেকে ফিরে এসে কাউকে কিছু না জানিয়ে চুপচাপ বাংলো কম্পাউন্ড থেকে লুকিয়ে বেরোলাম। বুক দুরুদুরু করছে, কিন্তু হাঁটছি। বেরিয়ে যখন পড়েছি কিছুটা না ঘুরে ফিরব না!

হাঁটতে হাঁটতে মোড়ের মাথায়, একটা রেস্তরাঁ পেলাম। চুপচাপ ঢুকে পড়লাম। ভেতরে বেশ কিছু লোকজন বসে। সবার চোখ আমার দিকে। থাকব, না বেরিয়ে যাব ভাবছি— কাউন্টারে বসে থাকা বয়স্ক এক জন লোক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইন্ডিয়ান?’ হ্যাঁ, বলে বললাম যে, এখানকার খাবার রোজ যেতে যেতে দেখি, খেতে ইচ্ছে করছিল তাই চলে এসেছি। বেশ খুশি হলেন। সঙ্গে অবাকও হলেন! জিজ্ঞাসা করলেন, কী করে এলাম? কেউ তো আসে না ভয়ে! আমাকে বললেন, এ ভাবে আসা ঠিক হয়নি। বিপদ এখানে না বলেই আসে। খুব যত্ন নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কী খাব। আমি কিছুই জানি না। বললাম, যেটা আপনার পছন্দ সেটা দিন। কিছু ক্ষণ পর একটা ডিশ এল। একটা ছোট গামলায় স্যুপের মতো কিছু! মাঝখানে একটা মাংস ভর্তি ঘটি বসানো। আর একটা প্লেটে তিন টুকরো করা গরম আফগান রুটি! জিজ্ঞাসা করলাম, কী করে খাব? উনি নিজেই খাবার প্রক্রিয়াটা বলে দিলেন! রুটিটা আরও টুকরো করে স্যুপে ডুবিয়ে রাখতে হবে। ঘটি থেকে মাংস বার করে স্যুপে ভেজানো রুটির সঙ্গে খেতে হয়।

কাবুলের সঙ্গে

বেশ ঝাল ঝাল গরম আর অসাধারণ খেতে। খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর টাকা দিতে গেলে কিছুতেই নিলেন না। বললেন, এত বছর হোটেল চালাচ্ছেন কিন্তু আজ অবধি কোনও বিদেশি একা এসে এখানে বসে খাননি।

উনি হোটেলের এক কর্মচারীকে আমার সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন বাংলোর গেট অবধি পৌঁছে দেওয়ার জন্য। অবাক হয়ে গেলাম… এ রকম আতিথেয়তাতে অভ্যস্ত নই তো! আর এটাও বুঝলাম, কিছু ভাল মানুষ সব জায়গাতেই আছেন। আর খুব খারাপ পরিস্থিতিতে তারা ভালই থাকেন!

ভালয় ভালয় অফিসের কাজ শেষ হয়ে গেল। ফেরার তোড়জোড় চলছে। কিন্তু, মনে তখনও একটা ইচ্ছে যে এখনও চার পাশে কিছুই দেখিনি। ভরসা আমার গাড়ির চালক আহমেদ সাহেব। এর আগে অনেক বার বলতেও যিনি রাজি হননি, তাঁকে গিয়ে ধরলাম… একটা দেশে এসে কিছু না ঘুরে যাব না! অনেক অনুনয় বিনয়ের পর কাজ হল…

এর পরের কিছু দিন উনি নিজে আমায় সঙ্গে করে ঘুরিয়েছিলেন। আর খাওয়া হোক কি ক্রিকেট খেলার সুবাদে হোক, দু’জন নিরাপত্তারক্ষী সঙ্গে যেতে রাজি হয়েছিলেন। এর পরের কিছু দিনে যা দেখলাম সারা জীবনে ভুলব না! রুক্ষ্ম পাথরের মরুভূমির মাঝে ঘন নীল লেক। জেড পাথরের এত বড় বড় টুকরো হতে পারে সেটা জানতাম না! গিয়েছিলাম হাতে বোনা কার্পেটের কারখানায়। যেখানে সিল্কের সুতো দিয়ে হাতে করে কার্পেট বুনে চলেছেন মহিলারা। যার সব চলে যায় মধ্য প্রাচ্যে! দাম জিজ্ঞাসা করে বুঝতে পারলাম, কার্পেট তো অনেক দূরের কথা, ৩ ফুট লম্বা আর ২ ফুট চওড়া টুকরো যেটা নমাজ পড়ার সময় ব্যবহার হয়, ওটাও আমার আয়ত্তের বাইরে! ফিরে আসার সময় অনেক শুকনো কিসমিস, বাদাম, খেজুর, এপ্রিকট— এ সব কিনেছিলাম আর কিছু টুকিটাকি…

ঘুরতে ঘুরতে বার বার মনে হয়েছে, এত সুন্দর একটা দেশ, পরিস্থিতি ভাল থাকলে যেখানে কোনও দিন টুরিস্টের অভাব হত না, সেটা সবার চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে পরিস্থিতির কারণে!

কাবুলের সঙ্গে

অনেক স্মৃতি আর অসাধারণ ছ’মাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে এসেছিলাম। আর কোনও দিন যাওয়া হবে কি না জানি না! কিন্তু ওখানে এত প্রতিকুলতার মধ্যে একসঙ্গে থেকে কাজ করে অনেক নতুন বন্ধু হয়েছে! কয়েক জনের সঙ্গে এখনও মাঝে মাঝে কথা হয়, আর যখনই কথা হয় সেই দিনগুলোর কথা আলোচনা করি!

কখনও ভুলব না ড্রাইভার সাহেব, কুক আর যারা আমায় সুরক্ষিত রেখেছিলেন তাঁদের কথা। তখন শেখা ওখানকার ভাষার অন্য শব্দগুলো এখন মনে না থাকলেও একটা শব্দ কখনও ভুলব না!‘তাশাখুর’ যা বাংলা করলে দাঁড়ায় ধন্যবাদ!

যদি কোনও দিন আবার ওখানে যাই আর সেই দোকানটা যদি থাকে, আর এক বার যাব! ওঁর হাত ধরে বলে আসব, ‘তাশাখুর’! তত দিন পর্যন্ত ‘তা দিদার বাদ’ অর্থাৎ বিদায়!

Be the first to comment on "কাবুলের সঙ্গে ভয়-ভাবনার প্রেমের ছ’মাস"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*